ধান, চাল, গম, ভুট্টা, ডাল, আটা, ময়দাসহ ১৯ ধরনের পণ্য সংরক্ষণ, সরবরাহ ও মোড়কীকরণে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে ২০১০ সালে আইন প্রণয়ন করে সরকার। তবে শুরু থেকেই আইন বাস্তবায়নে কঠোর হওয়ার ঘোষণা দিয়েই দায় সারছে পাট অধিদপ্তর। প্রতি বছর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে জরিমানা আদায় করা হলেও দেড় দশকেও আইনটি শতভাগ বাস্তবায়ন হয়নি।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রধান প্রধান ভোগ্যপণ্য আমদানি, মোড়কীকরণ ও বাজারজাত মুষ্টিমেয় কয়েকটি বৃহৎ করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এসব প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রির জন্য প্লাস্টিকের ব্যাগ তৈরির নিজস্ব কারখানাও রয়েছে। এসব কারখানায় ছোট-বড় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের জন্যও ব্যাগ তৈরি করা হচ্ছে। পণ্যে পাটের মোড়ক ব্যবহার আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে এসব কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। পাট অধিদপ্তর পাইকারি ও খুচরা বাজার, বিভিন্ন ছোট-মাঝারি রাইস মিলে অভিযান পরিচালনায় সীমাবদ্ধ থাকায় পাটের ব্যাগ ব্যবহার আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার ও চিনি সংরক্ষণ, সরবরাহ ও মোড়কীকরণে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। ২০১৭ সালের ২১ জানুয়ারি এ তালিকায় আরো যুক্ত করা হয় মরিচ, হলুদ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, আস্ত ধনিয়া, আলু, আটা, ময়দা ও তুষ-খুদ। ২০১৮ সালের ৬ আগস্ট পোলট্রি ও ফিশ ফিড যুক্ত করে ১৯টি পণ্য মোড়কীকরণে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়।
অবশ্য পাট অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম কার্যালয় সর্বমোট ৪৪টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে ৯ লাখ ৪৪ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। সর্বশেষ জুলাইয়ে তিনটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। মূলত জরিমানার পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ায় অভিযান হলেও আইন বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংস্থাটির দায়িত্বশীলরা। পাশাপাশি জনবলের অভাবেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না বলে জানিয়েছেন তারা।
জানতে চাইলে পাট অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. জাহিদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আইনটি বাস্তবায়নে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। কিন্তু ব্যবসায়ী ও কারখানা মালিকরা আন্তরিক না হলে পণ্যের মোড়কে পাটের ব্যবহার আইন বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। জেলা প্রশাসনের সহায়তায় সারা দেশের বাজার, মিল, কারখানায় অভিযান পরিচালনা করা হলেও সামান্য জরিমানার কারণে অনেকেই আইন প্রতিপালন করতে চায় না। শাস্তির বিধান বাড়িয়ে অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রাখা হলে কিছুটা হলেও আইনের বাস্তবায়ন হবে।’
দেশের প্রধান ভোগ্যপণ্য বাজার খাতুনগঞ্জ। সারা দেশে সরবরাহকৃত ভোগ্যপণ্যের প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ লেনদেন হয় এই বাজারে। বিশ্ব বাজার থেকে আমদানির পর সরাসরি মোড়ক হয়ে বিক্রির পাশাপাশি মিলে গিয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিক্রি করে এখানকার বেশ কয়েকটি শীর্ষ স্থানীয় করপোরেট শিল্প গ্রুপ। এসব প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনার হার নগণ্য হওয়ায় প্রকৃত অর্থে পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীদের জরিমানা করে আইনের শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
তারা বলছেন, খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাই এলাকায় ৯০ শতাংশেরও বেশি চাল আসে উত্তরবঙ্গ থেকে। একইভাবে অধিকাংশ ডালও আসে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে। উৎপাদন এলাকায় তদারকি না করে পাট অধিদপ্তর নিয়মিত বিরতিতে এখানে এসে ব্যবসায়ীদের জরিমানা করছে। এতে একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান শুরু হলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়। ফলে মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা করে শুরু করা কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে উৎপাদন ও মিল পর্যায়ে তদারকি বাড়ানো গেলে পাটের মোড়ক ব্যবহার আইন বাস্তবায়ন সহজ হবে।
চাক্তাই চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ওমর আজম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাটের ব্যাগ ব্যবহারের আইন বাস্তবায়ন কেবল বাজারকেন্দ্রিক অভিযানেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ব্যবসায়ীরা পণ্য মোড়কীকরণের সঙ্গে যুক্ত নয়। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অভিযানে এসে বলেন, আপনারা পাট ব্যতীত মোড়ক হলে পণ্য কিনবেন না। এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। উৎপাদক পণ্য বিক্রি করলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা ওই পণ্য কিনেই ব্যবসা করবেন।’
প্লাস্টিকের বস্তার দাম তুলনামূলক অনেক কম। এ কারণে খরচ বাড়িয়ে বেশি লাভ করতে ব্যবসায়ীরা পাটের ব্যাগ ব্যবহার করেন না। আবার একই সময়ে সবাই পাটের ব্যবহার না করায় ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কায় সবাই প্লাস্টিকের মোড়ক ব্যবহার করছেন। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোয় পাটের ব্যাগ ব্যবহার শতভাগ নিশ্চিত করা হলে সবাই একযোগে প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার কমিয়ে দেবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।